সালাফী দাওয়াতের মূলনীতি সমূহ(الأصول العلمية للدعوة السلفية)
লেখক কর্তৃক ১ম সংস্করণের ভূমিকা
(مقدمة الطبعة الأولى من المؤلف)
যাবতীয় প্রশংসা আল্লাহর জন্য। আমরা তাঁর প্রশংসা করি, তাঁর সাহায্য কামনা করি ও তাঁরই নিকট ক্ষমা ভিক্ষা করি। আমরা আললাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করি আমাদের মনের যাবতীয় মন্দ চিন্তা ও অন্যায় কর্মসমূহ হ’তে। কেননা তিনি যাকে হেদায়াত দান করেন, তাকে পথভ্রষ্ট করার কেউ নেই এবং তিনি যাকে পথভ্রষ্ট করেন তাকে পথ দেখাবার কেউ নেই। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, লা-শরীক আল্লাহ ব্যতীত কোন ইলাহ নেই এবং সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ (ছাঃ) তাঁর বান্দা ও রাসঅতঃপর শ্রেষ্ঠ বাণী হ’ল আল্লাহর বাণী এবং শ্রেষ্ঠ হেদায়াত হ’ল মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর হেদায়াত। আর নিকৃষ্টতম কর্ম হ’ল ইসলামের নামে সৃষ্ট নতুন নতুন অনুষ্ঠান সমূহ। কেননা ধর্মের নামে প্রত্যেক নতুন সৃষ্টিই বিদ‘আত। আর প্রত্যেক বিদ‘আতই ভ্রষ্টতা এবং প্রত্যেক ভ্রষ্টতার পরিণাম জাহান্নাম (আবুদাঊদ হা/৪৬০৭; নাসাঈ হা/১৫৭।
অতঃপর মুসলিম জাতি তার দীর্ঘ ইতিহাসে বহু বড় বড় ফিৎনার সম্মুখীন হয়েছে এবং এই দ্বীনের মধ্যে রকমারি বিদ‘আত ও গুমরাহী ঢুকে পড়েছে। পবিত্র কুরআনে নানাবিধ তাহরীফ (পরিবর্তন) ও সন্দেহবাদ আরোপ করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর সুন্নাত কখনো বানোয়াট ও জাল করার সম্মুখীন হয়েছে। কখনো তা রদ অথবা বাতিল করার সম্মুখীন হয়েছে। উপরোক্ত বিষয় সমূহের যেকোন একটিই দ্বীনের চিহ্নসমূহ মুছে দেওয়ার ও তার মূলনীতি সমূহ বিনষ্ট করার এবং দ্বীনের চেহারা পরিবর্তন ও ধ্বংস করে দেবার জন্য যথেষ্ট। যদি আল্লাহ স্বীয় প্রেরিত দ্বীনের হেফাযতের ইচ্ছা না করতেন এবং দ্বীনের মধ্যে সীমালংঘনকারীদের তাহরীফ বা পরিবর্তনের ও বাতিলপন্থীদের জালিয়াতির কলাকৌশল সমূহ ব্যর্থ করে না দিতেন এবং প্রতি যুগে এদের যাবতীয় কূট প্রচেষ্টা বিফল করে দেবার মত যোগ্য বান্দা সৃষ্টি না করতেন, তাহ’লে ইহূদী-নাছারাদের ধর্মের ন্যায় আমাদের এ দ্বীনের তরীদ্বীনের এই সংশোধন ও সংস্কার আন্দোলনই হ’ল সালাফী (বা আহলেহাদীছ) আন্দোলন, যা দ্বীনের মূলনীতিগুলিকে পরিচ্ছন্ন ও নির্ভেজালরূপে হেফাযত করেছে। এ থেকে সমস্ত বিদ‘আতকে ছাটাই করেছে। সকল ভ্রান্তি দূর করেছে। যাবতীয় অপব্যাখ্যা ও পরিবর্তন সমূহ সংশোধন ও পরিশুদ্ধ করেছে।
ন্যায়নিষ্ঠ ছাহাবীগণ (আল্লাহ তাঁদের উপর সন্তুষ্ট হৌন!) তাঁদের নিকট রক্ষিত (হাদীছের) আমানত পূর্ণভাবে আদায় করেছেন এবং কোনরূপ কাটছাট না করেই তা লোকদের নিকট পেঁŠছে দিয়েছেন। সব রকমের বাতিল ব্যাখ্যার বিরুদ্ধে তাঁরা ছিলেন সদা জাগ্রত। তাদের পরে এই ঝান্ডা বহন করেন তাবেঈ ও তাবে-তাবেঈগণ এবং তাদের পরবর্তীগণ। এ সময় ইসলামী খেলাফতের সীমানা বিস্তৃত হয় এবং পারস্য, রোম ও অন্যান্য জাতি ইসলামে প্রবেশ করে। তাদের অনেকেই ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় দ্বীনের মধ্যে এমন সব বিষয় প্রবেশ করাতে চায়, যা কখনোই দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত নয়।
সালাফী বিদ্বানগণ এর বিরুদ্ধে কিতাব ও সুন্নাতের পাহারাদার হিসাবে দাঁড়িয়ে যান এবং এ রাস্তায় তাদের জিহাদের ইতিহাস আমাদের জন্য সংরক্ষণ করে যান। তাঁরা বাতিলপন্থীদের বিরুদ্ধে শাসন ও রাজনীতির ক্ষেত্রে এবং জীবনের সকল দিক ও বিভাগে খালেছ দ্বীনের প্রসার ও প্রতিষ্ঠার জন্য দন্ডায়মান হন। যার ফলে তারা পরবর্তীদের জন্য ইল্ম ও ঈমানের ঝান্ডাকে নিরাপদ করে যেতে সক্ষম হন।
চিরকাল এই দ্বীন যুদ্ধের ময়দানে প্রবেশ করেছে তার একনিষ্ঠ লোকদের নিয়ে এবং পুণ্যবান ও বরকতময় সন্তানদের নিয়ে, যারা আনুগত্যকে কেবলমাত্র আল্লাহর জন্য খালেছ করেছেন। তারা আল্লাহর কিতাবের উপর ঈমান এনেছেন যেভাবে তা নাযিল হয়েছে এবং ঈমান এনেছেন রাসূল (ছাঃ)-এর সুন্নাতের উপরে, ঠিক যেভাবে তা এসেছে। তাঁরা এ দু’টিকে কঠিনভাবে অাঁকড়ে থেকেছেন এবং মাড়ির দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরেছেন। আর তাঁরা প্রত্যেক অপবাদ দানকারী পাপীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন, যারা এই দ্বীনের চারণ ভূমিতে পরিবর্তন, কমবেশীকরণ ও কাটছাটের দূরভিসন্ধি করেছে।
আমাদের এই যুগে দ্বীনের উপর হামলা বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে এই শতাব্দীতে দ্বীনের ব্যাপক নেতৃত্ব এবং সর্বব্যাপী সম্মানের কারণে অবিশ্বাসীদের অন্তঃকরণ গোস্বায় ফেটে যাচ্ছে। তারা মুসলিম উম্মাহর মর্যাদা ও বিজয়ের মূল উৎস তাদের প্রতিপালকের কিতাব ও তাঁর রাসূল (ছাঃ)-এর সুন্নাতের প্রতি মুসলিম সন্তানদের উদাসীনতা লক্ষ্য করেছে। তারা নিজেদের গর্দান থেকে তরবারি নামিয়ে রেখেছে এবং ঐসব লোকদেরকে দ্বীনের মধ্যে ফাসাদ সৃষ্টির কাজে লাগিয়ে দিয়েছে, যারা এর সঙ্গে শত্রুতা পোষণ করে। তারা প্রথমে নিজেদের সন্তানদের এ ব্যাপারে প্রশিক্ষণ দিয়েছে। অতঃপর মুসলিম সন্তানদেরকে তাদের ছাত্র হিসাবে গ্রহণ করেছে। ফলে তারা ওদের ভাষায় কথা বলে এবং ওদের ন্যায় চিন্তা করে। অবশেষে মুসলিম সন্তানেরাই ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং পিছন থেকে কিতাব ও সুন্নাহকে তীরবিদ্ধ করে।
এই ধ্বংসকারী ফিৎনার বিরুদ্ধে কেবলমাত্র ঐ সমস্ত লোকই ছিলেন, যারা প্রথম যুগের তাহযীব-তামাদ্দুন ও তরীকার উপর বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। যে তরীকাতেই ছিল প্রকৃত সম্মান, নেতৃত্ব, বিজয় ও শাসন কর্তৃত্ব। আল্লাহ রহম করুন ইমাম মালেক (রহঃ)-এর উপর। তিনি কত সুন্দরই না বলতেন,لاَ يُصْلِحُ آخِرَ هَذِهِ الْأُمَّةِ إلاَّ مَا أَصْلَحَ أَوَّلَهَا ‘এই উম্মতের শেষের লোকদের অবস্থা সংশোধিত হবে না ঐ বস্ত্তর মাধ্যমে ব্যতীত, যা তার প্রথম যুগের লোকদের অবস্থা সংশোধন করেছিল (অর্থাৎ কুরআন ও হাদীছ)’।[1] ছাহাবীগণ কিতাবুল্লাহকে জানতেন, যেমনভাবে তা নাযিল হয়েছিল। সুন্নাহকে জানতেন যেমনভাবে তা পৌঁছেছিল, প্রথম যুগের বিদ্বানগণের যুগ পরম্পরায় অনুসৃত মূলনীতি ও পদ্ধতি অনুযায়ী। অতঃপর তাঁরা দাঁড়িয়ে গেছেন বাতিলের বিরুদ্ধে যা বর্তমান পৃথিবীকে প্রায় পরিপূর্ণ করে ফেলেছে। আল্লাহ স্বীয় কর্মের উপর বিজয়ী। তিনি চান যে, এই উম্মতের মধ্যে একটি দল থাকুক, যারা ক্বিয়ামত পর্যন্ত হকের উপরে বিজয়ী থাকবে।
এই সংক্ষিপ্ত বইয়ের মধ্যে স্পষ্ট বিবরণ দান করা হয়েছে ঐ মূলনীতি সমূহের, যে সবের উপর কিতাব ও সুন্নাহর বুঝ ও তদনুযায়ী আমলের বিষয়ে প্রথম যুগের বিদ্বানগণের মাযহাব ভিত্তিশীল ছিল। আমরা এতদ্বারা তাদের পথের পথিকদের জন্য তাদের তরীকা ব্যাখ্যা করতে চাই। যাতে দ্বীনের মধ্যে কোন ভেজাল মিশ্রিত হ’তে না পারে এবং ধ্বংসকারী বাঁকা পথ সমূহের কারণে মানুষের নিকট প্রকৃত ‘ছিরাতে মুস্তাক্বীম’ অন্ধকারে ঢাকা না পড়ে।
পৃথিবী যতদিন থাকবে ততদিন পর্যন্ত যেন এই বইয়ের দ্বারা মানুষ উপকার লাভ করে এবং এটি যেন কেবলমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে হয় সেজন্য আল্লাহর নিকট প্রার্থনা জানাই। তিনি সর্বশ্রোতা ও দো‘আ কবুলকারী।
কাও মিটে যেত।
৮)ূল।