‘তোমরাই শ্রেষ্ঠ জাতি, যাদের উদ্ভব ঘটানো হয়েছে মানবজাতির কল্যাণের জন্য। তোমরা সৎ কাজের আদেশ করবে ও অসৎ কাজে নিষেধ করবে এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে’ (আলে ইমরান ৩/১১০)।
অত্র আয়াতে শ্রেষ্ঠ জাতির প্রধান দু’টি বৈশিষ্ট্য বর্ণিত হয়েছে সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ। এর পরেই বলা হয়েছে وَتُؤْمِنُونَ بِاللهِ এবং তোমরা ঈমান আনবে আল্লাহর উপরে। এখানে ঈমান আনার বিষয়টি পরে আনার কারণ হ’ল আমর বিল মা‘রূফ ও নাহী ‘আনিল মুনকারকে অধিক গুরুত্ব দেওয়া। এগুণটি সকল মানুষের মধ্যে কমবেশী আছে এবং সকলে এর মর্যাদা স্বীকার করে। কিন্তু অন্যেরা দুনিয়াবী স্বার্থের বশবর্তী হয়ে অনেক সময় একাজ থেকে বিরত থাকে। যেমন ঈমানের দাবীদার হওয়া সত্ত্বেও ইহুদী-নাছারাগণ এ থেকে দূরে থাকত। আল্লাহ বলেন, كَانُوا لاَ يَتَنَاهَوْنَ عَنْ مُنْكَرٍ فَعَلُوْهُ لَبِئْسَ مَا كَانُوا يَفْعَلُوْنَ ‘তারা যেসব মন্দ কাজ করত, তা থেকে পরস্পরকে নিষেধ করত না। তাদের এ কাজ ছিল অত্যন্ত গর্হিত’ (মায়েদাহ ৫/৭৯)। মুসলিম উম্মাহ যাতে এ কাজ থেকে বিরত না হয়, সেজন্য বিষয়টিতে জোর দেওয়ার জন্য প্রথমে আনা হয়েছে এবং ঈমান-এর বিষয়টি পরে আনা হয়েছে।
আমর বিল মা‘রূফ ও নাহী ‘আনিল মুনকারের সঙ্গে ঈমান আনার শর্তটি জুড়ে দেয়ার কারণ এই যে, অন্যেরা পার্থিব স্বার্থের অনুকূলে হ’লে একাজ করবে। কিন্তু বিপরীত হ’লে বা স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হলে করবে না। যেটি ইহুদী-নাছারাদের স্বভাব। তাদের মধ্যে শরীফ বা উঁচু ঘরের কেউ অপরাধ করলে তার শাস্তি হতো না। নিম্নশ্রেণীর লোকদের কেউ অপরাধ করলে তার কঠোর শাস্তি [1] মুসলমানদের মধ্যেও যারা দুনিয়াদার ও কপট বিশ্বাসী-মুনাফিক তাদের চরিত্র ইহুদী-নাছারাদের ন্যায়। ফলে তারাও একাজ থেকে বিরত থাকে। যেমন আল্লাহ বলেন, اَلْمُنَافِقُونَ وَالْمُنَافِقَاتُ بَعْضُهُمْ مِنْ بَعْضٍ يَأْمُرُونَ بِالْمُنْكَرِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمَعْرُوفِ ‘মুনাফিক পুরুষ ও নারী পরস্পরে সমান। তারা অসৎকাজের নির্দেশ দেয় ও সৎকাজে নিষেধ করে’ (তওবা ৯/৬৭)। পক্ষান্তরে প্রকৃত মুমিনদের সম্পর্কে আল্লাহ বলেন,وَالْمُؤْمِنُونَ وَالْمُؤْمِنَاتُ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ يَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ ‘মুমিন পুরুষ ও নারী পরস্পরে বন্ধু। তারা সৎ কাজের আদেশ দেয় ও অসৎ কাজে নিষেধ করে’ (তওবা ৯/৭১)।
আলোচ্য আয়াতে আমর বিল মা‘রূফ ও নাহী ‘আনিল মুনকার-এর পরেই ঈমান-এর কথা বলার মাধ্যমে ইহুদী-নাছারা ও মুনাফিকদের স্বার্থদুষ্ট চরিত্রের বাইরে এসে প্রকৃত ঈমানের সাথে স্রেফ আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষ্যে ‘আমর বিল মা‘রূফ’-এর দায়িত্ব পালন করার মাধ্যমেই কেবল ‘শ্রেষ্ঠ জাতি’ হওয়া সম্ভব, সেকথা বলে দেয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে আরেকটি বিষয় পরিষ্কার করে দেওয়া হয়েছে যে, মানুষের বানোয়াট সংস্কার বা তাদের রচিত বিধান আমর বিল মা‘রূফ হিসাবে নির্ধারিত হবে না। বরং এর সঠিক মানদন্ড হবে ‘ঈমান’। অর্থাৎ আল্লাহ প্রেরিত সত্য বিধানই হ’ল মা‘রূফ ও মুনকারের প্রকৃত মানদন্ড। কেননা বান্দার প্রকৃত কল্যাণকামী হলেন আল্লাহ এবং তাঁর বিধানই বান্দার বর্তমান ও ভবিষ্যৎ কল্যাণের চাবিকাঠি। তাঁর আদেশ-নিষেধই হল প্রকৃত অর্থে মা‘রূফ ও মুনকার। ফলে শরী‘আত অনুমোদিত বিধানই হ’ল মা‘রূফ বা সৎকাজ এবং সেখানে নিষিদ্ধ বিষয় হ’ল মুনকার বা অসৎকাজ। মুসলিম উম্মাহকে শ্রেষ্ঠ জাতির মর্যাদায় আসীন হ’তে গেলে সেটাই মেনে চলতে হবে, সেকথাই বলে দেওয়া হয়েছে ‘তোমরা আল্লাহর উপরে ঈমান রাখবে’ একথা বলার মধ্যে। কেননা দুনিয়াবী স্বার্থের চাপে মুমিনরাও অনেক সময় প্রবৃত্তিরূপী শয়তানের তাবেদারী করে। যা তকে শ্রেষ্ঠত্বের আসন থেকে নামিয়ে দেয়।
’ত।হ